নাম মুক্তা। নামেই মুক্তা। আসলে সে কালো কুচকুচে। তাতে কি? মেয়ে ফর্সা হলে যা কালো হলেও তা, অন্তত মা বাবার কাছে। ওর দিকে যখনই তাকাই মনটা কেমন হু হু করে ওঠে। এতো কালো। কিন্তু এর মধ্যে কোথায় যে আলো আছে, অন্য কেউ বুঝতে পারে কি-না জানি না, আমি পারি। মনে হয় আলো ঠিকরে পড়ছে। চোখ মুখ কান সব সুন্দর, তবে কালো। সেটাই খুঁত। আরেকটি খুঁত আছে অবশ্য। আর তা হলো সামনের দাঁতগুলো সামান্য উঁচু। ছি: এসব কি ভাবছি? মেয়েকে নিয়ে কেউ এরূপ বিশ্লেষণ করে।
: দেখো দেখো বাবা অন্তু কেমন হাসে। মুক্তা উৎসাহে আমাকে জানায়। অন্তু আমার একমাত্র ছেলে। বয়স আট মাস।
: হাসবেই তো। তুই যে ওকে আদর করছিস। জবাব দেই আমি।
: ও আমার সাথে বেশি কথা বলে বাবা। আবার জানায় মুক্তা।
: তুই যে ওকে বেশি ভালোবাসিস, তাই। আমি মুক্তাকে বলি।
: দেখো বাবা, অন্তু আমার আঙুল ধরে উঠতে চায়। মুক্তা খুবই উল্লসিত।
: ঠিক আছে মা, তোরা কথা বল। আমি একটু বেরুচ্ছি।
একথা বলেই দ্রুত বেরিয়ে আসি। মুক্তাকে আর কথা বলার সুযোগ দেই না। ও হয়েছে আরেক প্রগলভ। সুযোগ পেলেই শুধু বক বক করবে। আমি মনে মনে খুব খুশি হই। ছোট ভাইটাকে যে সে এতো আদর করে, মাঝে মধ্যে নিজের নাওয়া খাওয়াও ভুলে যায়। ভুলবেই তো। মেয়েটা একটু কেমন যেন। একা একা কথা বলে। গাছের সাথে, তারার সাথে, চাঁদের সাথে। রাতের বেলা জানালার কাছে উড়ে আসা জোনাকির সাথে। পাশের বাসার ছোট্ট রনি দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গেলে, তাকে সবার আগে তুলে আনবে মুক্তা। রনি যতটুকু না ব্যথা পায় তার চেয়ে বেশি ব্যথা পায় মুক্তা। তাই মুক্তা সকলের কাছে মুক্তা হয়েই আছে। ভাবতেই আমার ভালো লাগে খুব।
এই ক’দিন ভীষণ ব্যস্ততা ছিল আমার। অবশেষে গতকাল শেষ হলো সাহিত্য সম্মেলন। দেশ-বিদেশের সব খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের সম্মেলন হয়েছে এবার। তিনদিন ধরে সম্মেলনের বিভিন্ন পর্ব সাজানো, সঞ্চালনসহ যাবতীয় আয়োজনের দিক নির্দেশনা দেয়া ছাড়াও অতিথিদের যথাযথ আপ্যায়ন, খাওয়া-দাওয়ার সার্বিক দায়িত্বটাতো আমাকেই নিতে হয়েছিল। সম্মেলন শেষ হলেও এর সব কাজ এখনো শেষ হয়নি। ডেকোরেটরসহ বিভিন্ন স্থানে কিছু লেনদেন এখনো বাকি। তাই গিয়েছিলাম বাইরে। দুপুরের এই কাঠফাটা রোদে গলা শুকিয়ে চৌচির। তার সাথে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। এসেই হাঁক দেই গিন্নিকে। গিন্নি দৌড়ে আসে। বলে, তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধোও আর ছেলেকে ডাকো। আমিও ক্ষুধায় মরছি। বউটার এই একটা সমস্যা। আমি না আসা পর্যন্ত কিছুই খাবে না। কতো বলি খেয়ে ফেলো। কে শোনে কার কথা? যতই বলি, আমরা পুরুষ মানুষ, কত জায়গায় কত কি খাই। কিন্তু এসব কানেই তুলবে না। জিজ্ঞেস করলাম, ছেলে খায়নি কেন এখনো? গিন্নি জানায়, রাগ করে বসে আছে। আমার কথা শোনে না। তুমি গিয়ে রাগ ভাঙাও। আমার ছেলেটার কারণে-অকারণে রাগ করার রোগটা বড় ভয়াবহ। অবশ্য মুক্তা থাকতে এ নিয়ে বাবা মাকে ভাবতে হতো না। মুক্তা কিভাবে যেন অন্তুকে ম্যানেজ করে ফেলতো। মুক্তার কথা আমার ভীষণ মনে পড়ে গেলো। ইস্ মেয়েটা ঘরটা একেবারে খালি করে দিয়ে গেল। সাথে বুকটাও।
মুক্তা এখন কেমন আছে। ও কি এখনো আগের মতো আছে? এখনো কি গাছ দেখে, আকাশ দেখে, জানালার পাশে একলা একা বসে থাকে? প্রগলভ্ হয়? কথার খই ফোটায়, কাজ করে দৌড়ে দৌড়ে? আমাদের কথা ভাবে, একলা একা নিঝুম নিরালায়? মুক্তা তো সবার ঘরে থাকে না। আমার ঘরে ছিল, এখন নেই।
মুক্তা আসলে আমাদের মেয়ে না। যদিও মেয়ের চেয়েও বেশি। আমরা ওকে পেয়েছিলাম চট্টগ্রামের রাউজানে থাকার সময়। পোস্টিং নিয়ে সিলেটে চলে আসার ঠিক আগে। ওকে আমি সব সময় হাসি খুশিই দেখতাম। ও যখন ছোট্ট, তখন ওর জন্য আমার অফিসে যাওয়া কষ্টকর হয়ে যেতো। আমার অফিসে যাওয়ার সময় ও আমার দরজা আগলে দাঁড়াতো। বাবা তোমাকে যেতে দেবো না। বলে হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকতো। আমার চোখে জল এসে যেতো। ভাবতাম, ‘ওরে মোর মূঢ় মেয়ে, কেরে তুই…’। আহা কি মধুময়ই না ছিল সেই দিনগুলো।
মেয়েটা ভর দুপুরে কিংবা গভীর রাতে কাঁদতো। একা একা। ওর আম্মু মানে আমার মিসেস তাকে জিজ্ঞেস করতো, এর কারণ কী? প্রথম প্রথম না বললেও পরে বলতো, তার আসল মা-বাবার কথা। কোন এক বৈশাখী মেলায় হারিয়ে যাওয়ার কথা। সেই থেকে গিন্নি আমার প্রায় সময়ই আমাকে জ্বালাতো, ওর ঠিকানাটা বের করে দাও না, ওর মা বাবাকে বের করে দাও না। আমি গুরুত্ব দিতাম না। ও তার বাড়ি বলতে শুধু নওগাঁ জেলার কথাই বলতে পারতো। কোন গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা কিছুই বলতে পারতো না। কাজেই আমি আর এসবের গুরুত্ব দিতাম না। গিন্নিকে বলতাম, ওতো আমাদের মেয়েই, ওসব বাদ দাও। ওকে মানুষ করো। কিন্তু গিন্নি যে এতটা নাছোড়বান্দা। প্রথম প্রথম আমাকে বলতো, তোমাদের অফিসের এতো বিরাট নেটওয়ার্ক একটু খুঁজেই দেখো না। আমি পাত্তা না দেয়ায় সে যে এর পেছনে লেগেছিলো সেটা বুঝলাম দু’বছর পর।
একদিন অফিস থেকে ফিরছি। বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই গিন্নি আমায় ডগমগ হয়ে বললো, ওগো শুনছো, মুক্তার বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। আমি তো অবাক! বললাম, কী বলো, কিভাবে? সে বিস্তারিত জানায়। শুনে আমি তাকে জানালাম, দেখো এটি সঠিক কি-না? তবে ওর মা বাবা এখানে আসার সময় এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, প্রতিবেশী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আনবে, মেয়েকে সনাক্তের প্রমাণ দেবে, হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা বলবে। সব কিছু যাছাই বাছাই করেই মেয়েকে ফেরত দেবো। তা ছাড়া ওরা রাজি থাকলে মেয়েকে আমাদের কাছেই রেখে দেবো। কথামতো বাকি কাজ আবারো গিন্নিই করেছে। একদিন ওর মা বাবা আরো কয়েকজনকে নিয়ে হাজির; আমাদের পরিকল্পনা মতো। মেয়েকে প্রথমে সামনে আসতে দেইনি। মুক্তাকে অন্য কক্ষ থেকে পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখতে দিয়েছি। এখানে তোর মা-বাবার মতো কাউকে মনে হয়? মুক্তা দেখেই চিনে ফেলে, হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। ওর মুখ চেপে ধরি। ওর মা বাবার সাথে কথা বলে ওর কোন প্রমাণ, জন্মদাগ আছে কি-না, জানতে চাই, জানতে চাই ওর হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা। মা বাবার দেয়া বর্ণনা মেয়ের দেয়া বর্ণনার সাথে মিলে যায়। তা ছাড়া মায়ের চেহারা ও মেয়ের চেহারা হুবহু এক। শুধু বড় আর ছোট। মূল কপি আর কার্বন কপি। তারপর মা-বাবার সাথে মেয়ের দেখা হয়। মায়ের ও মেয়ের কান্নায় আকাশ ভারী হয়। মধুর মিলনে এতো আনন্দাশ্রু, জীবনে প্রথম দেখলাম। তারপর ওরা মেয়েকে নিয়ে গেলো। গিন্নি আমি ও অন্তু কেঁদে বুক ভাসালাম। বললাম, মুক্তার ইচ্ছে যখন হয় তখনই ওকে এখানে নিয়ে আসবেন। ওরা আচ্ছা বললো। অতঃপর আমাদের সকলের গলা ধরে কাঁদতে কাঁদতে, কাঁদাতে কাঁদাতে চলে গেল মুক্তা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত দু’সপ্তাহ আমাদের সকলের মন খারাপ। বিশেষ করে অন্তুর। তাই ওর মেজাজটা এখন খিটখিটে।
ছেলেকে ডাকছি, খেতে আসো। ওর নট নড়ন চড়ন অবস্থা। মুক্তার কথা আমার খুব মনে পড়ে গেল। এখন আর ক্ষুধাটা নেই। বাইরে দুপুরের ঝাঁঝাঁ রোদের দিকে চোখ। দৃষ্টি ফেরাতে পারছি না। হঠাৎ কে যেন জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে আমাকে। আর চিৎকার করে ডাকলো-বাবা। পাশের রুম থেকে চিৎকার করে ছুটে এলো অন্তু। ডেকে উঠলো-মুক্তা আপা। মুক্তা বললো, তোমাদের ছেড়ে আর কোথাও যাবো না বাবা। অশ্রুসজল চোখে মেয়েকে বুকে নিলাম। বুঝে নিলাম, আমাদের মুক্তা আমাদেরই।

Share.

মন্তব্য করুন