এক.
বেশ কদিন আমার এক বিশ্রী জ্বর হয়েছে। জ্বরের কি কোন আকৃতি আছে? জ্বর বিশ্রী কিংবা সুশ্রী হয় কিভাবে? আমি ঠিক জানি না জ্বরকে কেন বিশ্রী বলা হয়। কঠিন জ্বরে ভুগলে মানুষ বিশ্রী হয়ে যায়, সম্ভবত এ জন্যই কঠিন জ্বরকে বিশ্রী জ্বর বলা হয়। জ্বরটা কিভাবে হয়েছে ঠিক বুঝতে পারছি না। পুকুরে গোসল করতে নেমেছিলাম। ডুবোডুবি খেলছিলাম। হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন নিচের দিকে টানছে। আমি ভয় পেয়ে হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করতে লাগলাম।
তারপর? একবার নানাজানের সেকি জ্বর, সকালের জ্বর বিকেলে নেমে গেল। নানাজানের মুখ কেমন সুন্দর হয়ে গেল! আচ্ছা, এই জ্বরটিকে সুশ্রী জ্বর বলা যায়?
আমার জ্বরটা শুরু হয়েছে গত কয়েকদিন আগে। আজ ষষ্ঠ দিনে পড়লো। জ্বর নিয়ে আসলে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। বরং একদিন ক্লাসে যেতে হচ্ছে না এটিই বড় পাওয়া। রাতের দশ বারোটার দিকে জ¦রটা খুব বেড়ে যায়। তখন নাকি আমি কাউকে চিনতে পারি না। নানিজান সেদিন বললো, আমি নাকি উনাকে চিনতে পারছিলাম না।
তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলাম। চারপাশে মানুষ। একজন আমার পেটের উপর পাম্পিং করছে আর আমার মুখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে। আমার বুক ক্রমাগত হালকা হচ্ছিল। তখন আবার ঘোর ঘোর লাগলো। ঘুমিয়ে পড়লাম।
শুক্রবারের পর থেকে আমার সাথে অস্বাভাবিক সব ঘটনা ঘটতে লাগলো। এই যেমন রাতে ঘুমানোর সময় পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনা। ভারী গমগম কেমন অলৌকিক আওয়াজ। শনিবার রাতে ঘুমাচ্ছিলাম। ঠিক আজানের আগে পুকুরের পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। যেন কিছু একটা সাঁতার কাটছে অথবা কেউ লাঠি দিয়ে পানিতে বাড়ি মারছে। ফজরের আজানের পর সব শান্ত।
তৃতীয় রাতে আবার এমন হলো। কেমন গমগম একটা আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। শরীর গরম হতে শুরু লাগলো। গা থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো। মুখ দিয়ে ফেনা বের হলো। চোখের কোে দিয়ে গরম পানি গড়িয়ে পড়লো। আজানের পর শরীর হিম। একদম সাপের শরীরের মত ঠান্ডা। আজ সন্ধ্যায় ফানা ফকির নামে এক লোক আমাকে চিকিৎসা দিতে আসবেন। লোকটা ঠিক কেন আসবেন আমার জানা নেই। আমার মন বলছে লোকটা ভুজংভাজং হবে। এর আগে অনেক ফকির আমার দেখা হয়ে গেছে।
লায়লা আপা নামে আমার এক ফুফু ছিলো। আপা কিভাবে ফুফু হলো তা এক বিশাল ঘটনা। বাদ দিই। মূল গল্পে আসি। না গল্প না। চাক্ষুস ঘটনা। গঞ্জে সাপের খেলা দেখাতে সাপুড়েরা দিন কয়েক পরপর বাজারে বাজারে আসে। এমন এক বাজারের দিনে আমাদের বড় বাড়িতে সাপুড়ে এলো। তার এক বাক্সে সাপ অন্য বাক্সে বেজি। হাতে নানান জিনিস নিয়ে বাড়ির মহিলারা বসে আছে চারপাশে।
মহিলারা যখন সাপ দেখবে তখন পুুরুষরা দেখবে না এটাই নিয়ম। পুরুষরা বাজারে খেলা দেখবে। আমি ছোট হওয়ায় খেলা দেখছি। সাপুরে সাপটার নাম রেখেছে কালামনি। সাপুড়ে কি একটা মন্ত্র বলে আর মাঝে মাঝে কালামনি বলে চিৎকার মারে। সাপুড়ে কি একট মন্ত্র পড়লো আর সাপ ঘুরতে লাগলো। যার হাতের জিনিসটাকে গিয়ে সাপটা চুমু খাবে তার ভাগ্য বলে দিবেন সাপুড়ে। চারপাশে আগ্রহভরে সবাই মিলে অপেক্ষা করছে।
সাপটি লায়লা আপুর হাতে গিয়ে চুমু খেলো। সাঁপুড়ে গড়গড় করে বলে দিলো ‘যার হাতে চুমো খেলো তার সৌম্যদর্শন এক পুরুষ হবে, সংসারে শান্তি হবে।’ এই সুদর্শন পুরুষ একটি নয়, তিনটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। অর্থাৎ আপুর একের পর এক তিনজন স্বামী ছিলো, বলা বাহুল্য শান্তি ছিলো না।
তো আজ সন্ধ্যায় এমন এক সাপুড়ে টাইপের ফকির আমাকে ঝাড়তে আসবে। উঠোনে জলচৌকি পাতা হয়েছে। মোড়া ও পিড়া দেওয়া হয়েছে। হোগলা পাতার পাটি বিছানো হয়েছে। গোলাপজল ছিটানো হয়েছে। মোটের উপর আসল কথা এ এক এলাহি কান্ড। আমাকে পাটির উপর শোয়ানো হলো। বালিশ ঠেস দিয়ে আধশোয়া করানো হলো। ফকির সাহেব মাগরেব আজান পড়তেই আসলেন…। জ্বরের ঘোরে আমি তার গায়ে লালসালু ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর লালসালুতে যে পীর সাহেব আছেন কিংবা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘হাজার বছর ধরে’তে যে হোসেন মিয়া চরিত্র আছে তার মত বেতের টুপি পরা।
আচ্ছা আমি ওদের চেহারা কেন কল্পনা করছি? ব্যাপারটা কি এমন না যে আমি যা কল্পনা করছি তাই ঘটছে? আমিই কি আমার পৃথিবী সাজাচ্ছি? ফকির সাহেবের জন্য আতপ চালের ভাত রান্না হচ্ছে, সুঘ্রাণ আসছে। উঠোনে তিনি বসছেন সাহেবি ঢঙ এ। তারপর শুনলেন কিভাবে আমার রোগের শুরুটা হলো। জলপাই গুড়া আমার খুব পছন্দের। তেঁতুলের ভর্তা বানিয়ে খাওয়া আমি খুব পছন্দ করি। কিভাবে জানি এই ব্যাপারটা ফকির সাহেব জানেন।
ফকির সাহেব গলা খাকারি দিয়ে বললেন, বৃহস্পতিবার রাইতে তার রোগটা হইছিলো, শুক্কুরবারে না। সে ঐদিন এক গাছে উঠছিলো।’ কথা সত্য, জলপাই গাছে উঠার পর আমার গা কেমন ঝিম ঝিম করছিলো। আমার মনে আছে যে গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিলো আমার। আমি চমকে গেলাম। ফকির সাহেব জানেন কিভাবে? তিনি পানি পড়া দিলেন। সাধারণত ফকির বা হোমিও চিকিৎসকদের ঔষধি জিনিসের মূলে থাকে ¯্রফে সাদা পানি। কিন্তু ফকির সাহেবের পড়া পানিগুলো কেমন হলদে রঙের ছিলো। খেতে গেলে গলা কঁটার মত খচ খচ করে। রাতে খাওয়ার পর হড়বড় করে বমি করে দিলাম। বমির রঙ খুবই বাজে। নিজেরই তাকাতে ঘেন্না লাগছিল।
রাত একটা। ঘুম হচ্ছে না। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটা যেন ক্রমে জোরালো থেকে জোরালো হচ্ছে। আমি চুপচাপ শব্দগুলো শুনে যাচ্ছি। আচ্ছা, ঘড়ির কাঁটার শব্দের কোনো অর্থ আছে? আমি অর্থ খুঁজতে চেষ্টা করছি। শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর সেই বিভীষিকাময় মুহুর্ত। আমি এই গমগমে আওয়াজটার কোন মানে খুঁজে পাই না। কী বলতে চায়? কে বলতে চায়? আজ সপ্তম দিন এ যন্ত্রনা নিয়ে আমার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না। আমি যদি সেদিন পানি থেকে ভেসে না উঠতাম কি ক্ষতি হতো? এ অসহ্য যন্ত্রনাটা পেতে হতো না। রাত বাড়ছে। প্রতিটা রাতেই কি আমাকে এভাবে জাগতে হবে? কে জাগায়? কেন জাগায়? আমাকে কি কিছু বলতে চায়? আমি কি তাদের ভাষা বুঝি না? আজ ঘুমাবো না, দেখি কে আসে, কিভাবে আমি জাগি।

দুই.
রাত দুটার কিছু পরে নিশাচর কোন প্রাণীর ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ শুনলাম। তারপর ধীরে ধীরে যেন বুদবুদ উঠছে পানিতে এমন একটা শব্দ শুনলাম। বুদবুদের শব্দ গুলো ধীরে ধীরে তীক্ষ্ম হচ্ছে। কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। সহ্য সীমার উপরে উঠে যাচ্ছে ক্রমশ। আমি কানের দুপাশে আঙুল চেপে দিলাম। শব্দগুলো আরো জোরে হতে লাগলো। আমি নিজের অজান্তে চিৎকার দিয়ে উঠলাম, তারপর সব যেন শান্ত হয়ে গেলো। চিৎকারের শব্দে দৌড়ে মা এসে কান্না জুড়ে দিলেন। মায়েদের এই একটা জিনিস আমার সহ্য হয় না, কান্না।
আমি ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লাম। আবার ঘুম ভাঙলো। সেই গমগমে আওয়াজ। মাথায় অসহ্য যন্ত্রনা ঠেকাতে আমি অংক করতে শুরু করলাম। বুদবুদের আয়তন নিয়ে ভাবতে থাকলাম। ছোট বুদবুদের আকার, মাঝারি বুদবুদের আকার, আর বড়ো বুদবুদের আকারে কতটুকু পার্থক্য। ব্যাপারটা কি এমন না যে সব বুদবুদ সমান? ভাবতে ভাবতে তীক্ষ্ম একটা আওয়াজ শুনলাম। বিড়ালের আওয়াজ নাকি চিতাবাঘের মতো। কে জানে? ধীরে ধীরে আওয়াজটা বাড়াতে লাগলো। অসহ্য হয়ে উঠলো। প্রচন্ড চিৎকার দিলাম। তারপর সব কেমন নীরব হয়ে গেলো। ঘোর লাগা চোখ ঘুম এনে দিলো, ভারী হয়ে উঠলো শরীর…।
দশম দিন প্রথম তাদের শুনলাম। তারা কারা? তারা অনেকজন। অনেকের সম্মিলিত কন্ঠস্বর। কিছুই বুঝতে পারলাম না, কেমন একটা বুদবুদের শব্দ। আমি বুদবুদের অর্থ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এ বুদবুদ তো তাদের কথা বলার ধরন। আমি খুবই মনযোগ দিয়ে তাদের কথার প্রতিটা শব্দ শুনলাম। একসময় ধীরে ধীরে অসহ্য হয়ে উঠলো শব্দগুলো। আমি থরথর করে কাঁপতে লাগলাম। দুচোখ বন্ধ করে স্থির হতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাদের শরীরের তীব্র্র আলোকরশ্মি যেন আমাকে ভেদ করতে চাইছে। কোয়ান্টাম জগতের খেলা চলছে যেন।
আজানের পর সব চুপচাপ হয়ে গেলো। এমন একটি অলৌকিক ঘটনা আমার সাথে ঘটে চলছে অথচ ঘরের কেউ জানে না। আমার জ্বর উঠানামা করতে লাগলো। মাঝে মাঝে বমিও হচ্ছে, বলতে গেলে কিছুই খাচ্ছি না। তারপরও বমি কিভাবে হচ্ছে কে জানে। আজ ঊনিশতম দিন। তাদের বুদবুদের ভাষা আমি বের করার প্রচন্ড চেষ্টায় আছি। আমার মনে হচ্ছে তারা কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করে। কিছু একটা মানে কোনো একটা জগৎ। তাদের সম্ভবত নিজস্ব কোনো আলাদা জগৎ আছে। সে জগৎটি কিভাবে আমার জগতে ঢুকে পড়েছে? নাকি আমিই তাদের জগতে ঢুকে পড়েছি। আমি যেমন তাদের অনুভব করি, তারাও কি আমাকে অনুভব করে? নাকি তারা জানেই না যে কেউ একজন তাদের শব্দ শিখতে চেষ্টা করছে। তাদের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করছে। এতো কাছাকাছি বাস অথচ অদৃশ্য এক দেয়াল তোলা তাদের আর আমার মাঝে। আমি এই দেয়ালটির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। আচ্ছা আমি যদি এই দেয়ালটি ভেদ করতে পারি, তাদের জগতে কি পুরোপুরি একাত্ম হতে পারবো?
পঁয়তাল্লিশতম দিন। এই মুহুর্তে ডায়েরি লেখায় বুদবুদ ভাষাটা ব্যবহার করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু তাদের লিখন পদ্ধতি আমি জানি না। নাকি আমাকে জানতে দেওয়া হচ্ছে না। এই তাদের জগৎ কেমন? ওটা কি আত্মার জগৎ? আমি উত্তরগুলো খোঁজার চেষ্টা করেছি। কে জানে হয়তো পেয়েও যেতে পারি। আমি আমার ভাবনাগুলোকে কোয়ান্টায়ন করছি। দেয়ালের ওপারে আরেকটি দেয়াল আছে। যে দেয়ালটি আগে কখনো দেখিনি। এখন আমার কথাগুলি নিরেট ইট পাথরের দেয়ালে বাড়ি খায় না। বরং কোনো অদৃশ্য দেয়ালে গিয়ে ফিরে আসে।
শক্তি ধীরে ধীরে তার গতি হারায়, অথচ এই বুদবুদ ভাষার গতি বাড়ে। আমি অনুভব করলাম দেয়ালে বাড়ি খেয়ে শব্দগুলো ধীরে ধীরে তীক্ষ¥ হচ্ছে। বিড়াাল ৫০ থেকে ১৫০ হার্জের তীক্ষ¥ শব্দ করতে পারে। বিড়ালের সাথে কি কোনো যোগসাজশ আছে? আমি কি রহস্যের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি?
আজ একশতম দিন। জ্বরের ঘোরে আজকাল আমি নাকি বুদবুদ ভাষা আওড়াই। অনেক বিশেষ্য ডাক্তার আমাকে দেখেছেন। কেউই কোন সুরাহা করতে পারেননি। এখন যে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে আছি তিনি হচ্ছেন হামিদুর রহমান সাহেব। তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আমি অবাক হয়ে ভাবি যে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের এতো ধৈর্য কিভাবে থাকে। ঘন্টার পর ঘন্টা তিনি আমার অদ্ভুত বুদবুদ টাইপের শব্দগুলো মনযোগ দিয়ে শুনছেন। তারপর কি জানি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নোট করছেন। আমি যখন বুদবুদ ভাষা ইউজ করি, রোগের কথা বলি নিজের ভাষায়, বুদবুদ বুদবুদ করে, তখন ডাক্তার কি বুঝেন কে জানে। আমি সম্ভবত ধীরে ধীরে পৃথিবীর কথা বলা ভুলে যাচ্ছি। ইদানিং ডায়েরিতেও বুদবুদ বুদবুদ লিখছি। আমার খুব কাছের বন্ধুরা আমাকে দেখতে এলে তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বুদবুদ বুদবুদ ছাড়া কিছু বের হয়নি। আমি ইচ্ছে করলে কথা বলতে পারতাম, কিন্তু এই পৃথিবীর ভাষায় কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তারা কি আমাকে পাগল ভেবেছে? অবশ্যই ভাববে। কিন্তু আমিতো তাদের প্রতিটা কথার জবাব দিয়েছি। এখন রাত তিনটা দশ। নিশাচর পাখির শিসের সাথে চোখে ঘুম নেমে আসছে। কিছুক্ষণ পর আবার জাগতে হবে, তারা আসবে…।
আজ জ্বরের একশো একান্নতম দিন। ইদানিং নিজেকে মানুষ মনে হচ্ছে না। কেমন বোধ-বুদ্ধিহীন প্রাণীর মতন মনে হচ্ছে। সাইকোলোজিস্ট হামিদ সাহেব ইদানিং সম্ভবত আমার ভাষা বোঝেন। তিনিও বুদবুদ ভাষায় আমাকে কিছু কথা বলেন। এখন পৃথিবীর ভাষা বোঝারও আমার দরকার পড়বে না। আমি পৃথিবীর সব ভাষা ভুলে যাবো। যদি না ভুলি তাহলে তাদের সাথে মিলবো কিভাবে? কবি রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা মনে পড়ে গেলো। ‘আমরা সবাই রাজা, আমাদের এ রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কি শর্তে।’ আচ্ছা এই কবিতাটা বুদবুদ ভাষায় ট্রান্সলেট করলে কেমন হয়? বুদবুদ বুদবুদ বুদবুদ বুদবুদ….। না হচ্ছে না। আরেকদিন ট্রাই করবো। আমাকে এখন ঘুমোতে হবে। ঐযে পাখি শিস দিচ্ছে। যে পাখিটা শিস দিচ্ছে তার নাম কি? নিশাচর প্রাণীদের একটার ছবিই শুধু চোখে ভাসছে, হুতুম প্যাঁচা। এটা কি প্যাঁচার ডাক? কিন্তু প্যাঁচা তো একটানা এভাবে ডাকে না। তাহলে? আমাকে পাখিটা চিনতে হবে। পাখিটা নিশ্চয়ই তাদের জগতের কেউ একজন। তাদের জগতটা ট্রেস করতে পাখিটাকে ট্রেস করতে হবে। হাহ! আজ কেমন জানি ঘুম পাচ্ছে…।
পাখিটাকে দেখতে কেমন হবে? আমার প্রিয় কালার নেভি ব্লু’র মত?

তিন.
জ্বরের ১৭৯ তম দিন। কেন জ্বরের ১৭৯ তম দিন হিসেবে তারিখ হিসাব করছি? আমি ইদানিং তারিখ দেখা ভুলে গেছি। চেষ্টা করলেই দিন তারিখ দিয়ে লিখতে পারতাম। কিন্তু আমি পৃথিবীর চিরচেনা জগতটাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই। যতো দূরে সরাবো ওটা ঠিক ততটাই কাছে আসবে। সেদিন কাঁটাবনের কনকর্ড এম্পোরিয়ামের সামনে দেখলাম ব্লু-বার্ড নামের একটি পাখি বিক্রির দোকান। অবশ্য এখানে অনেক পাখি বিক্রির দোকান আছে। তো এই ব্লু-বার্ড পাখির দোকানে একটি প্যাঁচা দেখলাম। প্যাঁচা জিনিসটাকে কেন লক্ষ¥ীপ্যাঁচা বলা হয় আদতে আমার ধারনা নেই। এ প্যাঁচাটাকে লক্ষ¥ী বলা যায়। প্যাঁচাটির দিকে আঙুল তাক করে মাকে কিনতে বললাম। কিন্তু মা আমার কথা শুনলেন না, আসলেই কি শুনলেন না? নাকি বুঝলেন না। আমি সম্ভবত বুদবুদ ভাষায় কথা বলেছিলাম! বুদবুদ ছাড়া আমি আর কোন ভাষা বলতে পারছি না ইদানিং। তবে লিখতে পারছি, আমাকে এই লেখাটাও ভুলতে হবে। আমার কথা বলার প্রয়োজন হয় শুধু সাইকিয়াস্ট্রিক হামিদুর সাহেবের সাথে। তিনি ইদানিং আমার ভাষা বোঝেন। আমিও তার বুদবুদ ভাষা বুঝি। সুতরাং আমি চিরাচরিত পৃথিবীর ভাষা ভুলে গেলেই বা কি!
জ্বরের ২২০তম দিন আজ। আমি ঠিক একটা পোকার মত বিচ্ছিরি হয়ে গেছি। লোকজন আসে আর আমার দিকে ঘৃণাভরে তাকায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে এভাবে তাকানোর জন্য তারা লজ্জিত হয়। লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের চোখে অসহায় একটা ভঙ্গি ফুটে ওঠে। আমি বুঝতে পারি, দিনের পর দিন বিছানায় থাকতে থাকতে অনেক বাস্তবতা বুঝেছি।
ইদানিং আমার ডায়েরীতে লেখাগুলো অনেক বড়ো বড়ো হয়ে যাচ্ছে। যে ভাষাটি ভুলতে যাচ্ছি, সে ভাষায় শেষ লেখাগুলো লিখছি। আমি মজার একটা জিনিস দেখলাম সেদিন, ব্লু-বার্ড নামের দোকানটিতে কোন নীল পাখি নেই। নীল পাখি ঠিক কেমন তা আমি জানি না। আমি নীল রং চোখে দেখি না। মানে আমি বর্ণান্ধ। আমার মতো নাকি আইনস্টাইনও কালার ব্লাইন্ড ছিলেন। আচ্ছা তিনিও কি বুদবুদ ভাষা জানতেন?
গত পরশু ভারতের খেলোয়াড় মহেন্দ্রন সিং ধোনীর একটি বায়োগ্রাফিক ফিল্ম দেখলাম। আমি অবশ্য হিন্দি বুঝি না, ছোট থেকেই এই একটা ভাষা শিখতে চাইনি। হিন্দি কোনো চ্যানেলে যদি কিছু বলে তবে সাউন্ড অফ করে সাব টাইটেলে থাকা ইংলিশ লেখাগুলো পড়ি। ‘ধোনি, দি আনটোল্ড স্টোরি’ ছবিটি দেখলাম। বুঝলাম, ধনি কালার ব্লাইন্ড। আচ্ছা আমার মতো ধোনিও কি বুদবুদ ভাষা বোঝেন? কে জানে।
ইদানিং সবাইকে আমার মতো ভাবছি। যে কারো সাথে বুদবুদ ভাষায় কথা বলতে চাচ্ছি। তারা ডাক্তার হামিদুর রহমানের মত আমার ভাষা বোঝে না কেন? আর ঠিক কত দিন বাঁচবো বলতে পারছি না। তার আগেই তাদের জগতটাকে চিনে নিতে হবে। বুঝে নিতে হবে ওরা কারা। ডাক্তার হামিদুর রহমান গভীর মনযোগ দিয়ে লাল ডায়েরিটা দেখছেন। বেশ কিছু জায়গায় তিনি লাল দাগ দিয়ে রেখেছেন। এরমধ্যে তাকে নিয়ে যেসব কথা আছে তাতেও লাল দাগ দিয়েছেন। বর্ণান্ধদের নিয়ে যেসব লেখা আছে তাতেও দাগ দিলেন।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি ফাইল নামালেন। মিস্টার হামিদুরকে গভীর চিন্তায় মগ্ন মনে হচ্ছে। তার দ্বিতীয় আনসলভড রোগীর সকল বিবরণ খুঁটিয়ে দেখছেন। প্রথম রোগীর আচরণের সাথে মিলে যাচ্ছে এই রোগীটির আচরণ। যে বিষয়টি হামিদ সাহেবকে ভাবাচ্ছে তা হলো মানব সমাজের জন্য এক বৃহত্তর রোগ বহন করে চলছে এই দুই রোগী। এই দুই রোগী আসলে তার গিনিপিগ। এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়বে ধীরে ধীরে। একের পর এক লোককে আক্রান্ত করবে। আক্রান্তরা পৃথিবীতে থাকার যোগ্যতা হারাবে। এ পৃথিবী সুস্থদের জন্য…। পৃথিবীকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এক মস্তিষ্কঘাতি ভাইরাস। এই জীবাণু এখন নীরব বিপ্লেবের অপেক্ষায়।
জ্বরের ২৪০ তম দিন । আমি তাদের জগতে প্রায় ঢুকে পড়েছি। আর খুব বেশি দেরি সম্ভবত নেই। এ পৃথিবীটা আমার কাছে অসহ্য লাগছে। কেউ কি ঐ জগতে যেতে আমাকে সাহায্য করবে? আমি সূত্র ছাড়াই কোয়ান্টামের এক নতুন জগত আবিস্কার করছি। আমি ঠিক এ জগতটি বর্ণনা করতে পারব না। বোঝাতে পারবো না, শুধু নিজে দেখতে পারবো। এ জগতের শুরু শূন্যে, শেষও শূন্যে। মাঝে নিরেট ফাঁপা। সে জগৎটা তাহলে কি? কোয়ান্টাম মেকানিকস বলে শূন্যস্থান শূন্য নয়। সেখানে প্রতি মুহূর্তে কণা জড়ো হচ্ছে এবং জোড়ায় জোড়ায় সংঘর্ষে সাথে সাথেই ধ্বংস হচ্ছে। আচ্ছা, এ জগতটি কি ব্ল্যাকহোল? আমি খুবই উদ্বেলিত। আমার পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুলের উপরে একটি তিল আছে। তিল জিনিসটা খুব ছোটো, শূন্যের মতো। এটা দিয়েই এই জগতটা ব্যাখ্যা করা যায়। আমি ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করবো। ব্যাখ্যাটা হয়ে গেলেই আমার কাজ শেষ। এই ভাষায় আর লিখতে হবে না। ব্যাখ্যাটা নিয়ে ভাবছি, আমি এতোদিন ঠিক এ বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম। এটাকে এক ধরনের গবেষনা তো বলা যায়। গবেষনা বলে সম্মান দেওয়া যায়। এখন শুধু এ গবেষনার ফল প্রকাশের পালা। ভাবছিলাম এক্ষুণি প্রকাাশ করব। কিন্তু প্যাঁচার মতো কন্ঠে কে যেন ডেকে উঠলো!
ভালো কথা, তিল কেন হয়? সূর্যরশ্মির কারণে তিল হতে পারে। আবার জন্মগতও হতে পারে। কিন্তু ইদানিং আমার শরীরে প্রচুর তিল উঠছে। ধীরে ধীরে এমন অবস্থা হচ্ছে যে, তিল ধারনের ঠাঁই নাই যেন! তিলও কি ওদের জগতের প্রতীক? কে জানে খুব দ্রুতই জানবো। আহ্ মাথায় ব্যথা শুরু হয়ে গেলো। হামিদুর রহমান সাহেবের মন খুব বিষণœ। ছেলেটি জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলো, তবু তাকে মরে যেতে হলো। ইদানিং হামিদ সাহেব স্মৃতিভ্রষ্ট হচ্ছেন। এই রোগটা কি ছেলেটির মৃত্যুর পর থেকে নাকি আরো আগে থেকে তা তিনি ঠিক মনে করতে পারছেন না। শরীরে তিলের পরিমাণ বাড়ছে। তিনি নিজের রোগ ঠিকই ধরতে পেরেছেন। ধীরে ধীরে চিন্তা ভাবনার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। ইদানিং তিনি কোয়ান্টাম জগত নিয়ে ভাবেন, শূন্যের জগত নিয়ে ভাবেন। তিনি একটি সমাধানের খুব কাছে চলে এসেছেন। এই সমাধানটি তিনি লিখে ফেললেন। এবার তিনি কিছু সায়ানাইড নিজের মুখে ঢুকিয়ে দিলেন। পৃথিবীতে ডাক্তার হিসেবে আসা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে তিনি ফিরছেন তার ভু-উপগ্রহে। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন একটি নতুন মানুষ।

চার.
১৫ ঘন্টা পর। দরজা ধাক্কাধাক্কি চলছে। দরজা ভেঙে যখন ডা. হামিদের লাশ বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তখন ডা. হামিদের পায়ের কাছে সুইসাইড নোট বা এমন কিছু একটা পাওয়া গেলো। পুরো কাগজে শুধু একটাই লেখা বুদবুদ বুদবুদ বুদবুদ। পৃথিবীতে যখন কান্নার রোল, একটি অজানা গ্রহে অথবা অন্য কোথাও হয়তো একটি নতুন মানুষের উন্মেষকালের আনন্দক্ষণ বয়ে যাচ্ছে। বিপুলা এই বিশ্বজগতের কতটুকুইবা ভূ-গ্রহের মানুষেরা জানে?

Share.

মন্তব্য করুন