গ্রামের নাম, মিঠাইপুর। এ গ্রামে অনেক মানুষের বসবাস। নিত্য নতুন মেহমানের আগমন। গ্রামের মানুষজন সাদাসিধা জীবনযাত্রায় পাড়ি দেয়। মাটির মিঠে ঘ্রাণ আর প্রকৃতির নিদারুণ রূপ উপভোগ করে সারাদিন। শহুরে জীবনের মতো রঙিন আর চার দেওয়ালে আবদ্ধ না হয়ে মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে কেটে যায় তাদের প্রতিটি দিন।
বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে ইটের রাস্তা। এপাশে মানুষের বসতবাড়ি। আর রাস্তার ওপাশে গ্রীষ্মকালীন বিলের রূপ। মাথার উপরে গগন জোড়া শুভ্র নীল আকাশ। বিকেলে বিলের পূর্ব দিগন্তে আকাশ নামে। মিষ্টি সকালে রোদ ওঠে, আলো ছড়ায় পুরো পৃথিবীজুড়ে। সকাল হতেই দেখা যায় চাষা ভাই জোয়াল কাঁধে গরু হাঁকিয়ে মাঠে ছুটছে। ভূমি খনন করে চাষ করা হয় কচি ধানের চারা। চারা তুলে রোপণ করে চাষারা। কিছুদিন পর সবুজে সবুজে ছেঁয়ে যায় গোটা মিঠাইপুর। মোহনীয় কোমলতা ফুটে উঠে।
চাষিদের মুখে হাসি ফুটে। কারণ, অন্তিম সময় ঘনিয়ে আসার পালা। সোনালি ধানের দেখা মেলবে তাদের দু-নয়নে। দেখতে দেখতে গোটা বিল সোনালি রূপ ধারণ করল। শুরু হলো নবান্ন। ধানের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে পুরো গ্রাম।
ঢেঁকিতে ধান ভানার উৎসব শুরু হয়। প্রতিটি বাড়িতে পিঠাপুলি তৈরির ধুম পড়ে যায়। গোলা ভরে যায় সোনালি ধানে। মাথার উপর নীল আকাশের চাঁদোয়া। ফাঁকা বিলের মাঠে ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি উড়ায়। এদিক সেদিক ছুটে বেড়ায়। এসময় অসহ্য গরম পড়ে। চাঁদনি রাতে সবাই মাদুর পেতে গল্পের আসরে মেতে উঠে। বিদায় নেয় গ্রীষ্মকালের রূপ আর তীব্র গরম।
গ্রীষ্মের তাপদাহে ধরণী যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন প্রকৃতিতে নবজীবনের আশ্বাস নিয়ে, তৃষিত মাটির বুককে সিক্ত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আগমন করে বর্ষাকাল। নীল আকাশ এখন মুহূর্তেই ঘন কালোর রেখা ধারণ করে পৃথিবীতে নামিয়ে আনে বৃষ্টির পরম ছোঁয়া। বৃষ্টির বিছানায় ছেলেমেয়েরা গড়াগড়ি খায়, কাদা ছুড়ে, ফুটবল নিয়ে মাঠে ছুটতে থাকে। গ্রামের রূপ বদলে বাদলের ধারায় পরিণত হয়। পুকুর, ডোবা, খাল, বিল পানিতে থই থই করে। বিলের পানিতে মাছের দেখা মেলে। কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ সবাই জাল ফেলে, ছিপ ফেলে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করে। নীল বেগুনি, সাদা শাপলা ফুলে ভরে ওঠে বিল। ছেলেমেয়েরা ভেলায় চড়ে শাপলা তুলে আনে। শাপলার লম্বা ডাঁটা দিয়ে গলার হার তৈরি করে। শাপলা ফলের বীজ খায়। শাপলার সবুজ ডাঁটা তরকারি হিসেবেও খাওয়া যায়। ছেলেমেয়েরা কাগজের নৌকা বানিয়ে তার উপর ছোট্ট কাগজের পুতুল দিয়ে ভাসিয়ে দেয় পানির মিহি স্রোতে। চলে যায় অজানায়।
প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মিঠাইপুর সহ প্রত্যেকটি গ্রাম। বৃক্ষরাজির সুশীতল ছায়া, লতা গুল্মের মায়াময় বেষ্টনী, পাখপাখালির কলরব প্রত্যেকটি গ্রামেই দেখা যায়। বাংলার বুকে গ্রাম মানেই প্রশান্তির এক চিরন্তন আধার।

Share.

মন্তব্য করুন