কিরে মিজান কী অবস্থা তোর? ঢাকা থেকে বন্ধু আরিফের ফোন।
– এইতো, ফজর পড়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়েছি মাত্র।
– এবার শহরেই হাড়কাঁপানো শীত। আর তুই কিনা এই শীতে বেড়াতে গ্রামে। তাও আবার উত্তরবঙ্গে! যে জায়গায় শীতের বসবাস বললেই চলে। তোর সাহস আছে ভাই মানতে হবে!
– কী করব বল, নাড়ির টানে আসতে হয়েছে। জন্মভূমির টান কি আর পৌষ-চৈত্র মানে? তাছাড়া গাঁয়ের শীতের পিঠা কতদিন যে খাই না মনেই আনতে পারছি না। বলতে গেলে দাদিমার হাতের পিঠা খাওয়ার জন্যই এসেছি। মা বলেন দাদিমা না-কি দশ-বারো আইটেমের পিঠা বানাতে পারেন। খেয়েছিও তাই। অন্দশাপিঠা, দুধপিঠা, ডিমপিঠা, নারকেলপুরী, চিতাইপিঠা (চিতইপিঠা), ভাকাপিঠা (ভাপাপিঠা), আরো হরেকরকমের নাম। আইটেম প্রায় শেষের দিকে। দু’তিনটে আইটেম খাওয়ার এখনও বাকি।
মিজান একটু থেমে বলল, আর তুই যা-ই বলিস, গ্রামীণ শীতের মাত্রা বেশি থাকলেও এর মজাও দ্বিগুণ।
– হয়েছে হয়েছে অনেক বকেছিস। তবু বলি আর বেশিদিন থাকিস না। এবারের শীত শহরেই যেভাবে জেঁকে বসেছে, আল্লাহ ভালো জানেন তোদের উত্তরবঙ্গে কী অবস্থা!
– হু। আর থাকছি না। আগামীকাল আসার চিন্তা-ভাবনা করছি। ভালো থাকিস আরিফ। আল্লাহ হাফেজ।
আরিফকে বুঝতে দেয়নি শীতে কিভাবেই না কাবু হয়েছে, হচ্ছে মিজান। না হয় আরিফ কি যেন জয় করে ফেলেছে এমন মনোভাব নিয়ে বলে বসবে, আমি আগেই বলেছিলাম এ শীতে গাঁয়ে যাসনে। শুনলি না তো। এবার বোঝো গ্রামীণ শীতের উৎপাত কেমন!
দিনাজপুর কাহারোল হয়ে সুন্দরপুর সেগুন ডাঙায় নিজানদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর মিজান এসেছে বেড়াতে। মিজানরা শহুরে মানুষ। চাচা-মামা দাদা-নানারা গ্রামেই থাকেন। তাই এবার দাদার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে মিজান। এসেছে বেশ কয়েকদিন হল। শীতের পিঠা খেতে এসে বেচারা শীতের আখড়াতেই পড়েছে বোধহয়।
মিজানের বেড়ে ওঠা শহরে হওয়ায় এমন হাড়কাঁপানো শীতের কবলে এর আগে কখনই পড়েনি সে। শহরেও শীত নামে কিন্তু এমন শীত কি মিজান কখনো দেখেছে! যে শীত শরীরের দু-তিনটে শীতকাপড় ভেদ করে শরীরের হাড় কাঁপিয়ে দেয়! শীতকাপড়ের উষ্ণতাকে শীতল করে শরীরকে বিবশ করে তোলে!
মিজানের দাদা-দাদি ও চাচা-চাচিরা একটু শিক্ষিত হওয়ায় তাদের কথা বুঝতে মিজানের তেমন বেগ পেতে হয় না। তারা অন্যদের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেও যতটুকু পারেন মিজানের সঙ্গে শুদ্ধস্বরে কথা বলেন। তাই মিজান তাদের কথা বুঝতে পারে। কিন্তু পড়শিদের কথা শুনে মিজান হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আর বুঝে না বুঝে শুধু মাথা নাড়িয়ে যায়।
আরিফের সঙ্গে ফোনে কথা শেষ করে মিজান চাদর দিয়ে নাক মুখ পেঁচিয়ে ঘর থেকে বের হয়। দেখে খড়কুটো জ¦ালিয়ে শীত নিবারণের জন্য গোল হয়ে বসে আগুন পোহাচ্ছেন দাদা ও চাচাদের সঙ্গে আরো অনেকে। কেউ কেউ চাদরমুড়ি দিয়ে কোলে নিয়ে বসে আছেন তাদের সোনামণিদের। মিজান আসার পর থেকেই দেখে আসছে প্রতি সকালে কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারেই চাদরমুড়ি দিয়ে গোল করে আগুন পোহান তারা।
মিজান এবার এগিয়ে আসল। দাদা তাকে দেখে এগিয়ে এসে অস্থির গলায় বললেন, এতো সকালে বের হয়েছো কেন দাদু ভাই! সূর্য উঠুক, বাতাস কমুক এরপর বের হয়ো। যাও ঘরে যাও।
দাদা আমি আপনাদের সঙ্গে আগুন পোহাতে বের হয়েছি। মুখের চাদর একটু সরিয়ে বলল মিজান। আসার পর থেকেই দেখে আসছি আপনারা আমাকে ঘরে রেখে এখানে গোল হয়ে বসে আগুন পোহান। আর গালগল্প করেন। আজ আমিও আপনাদের সঙ্গে আগুন পোহাব, আপনাদের রূপকথার গল্প শুনব।
দাদা কিছু না বলে পাশে বসালেন মিজানকে। মিজান চাদরের ওম দেখে হাত দুটো বের করে আগুনের তাপ অনুভব করছে।
দাদা আমি চলে যেতে চাচ্ছি। হঠাৎ করে বলে ওঠে মিজান। আমি আর থাকতে চাচ্ছি না গ্রামে। তাছাড়া অনেকদিনই তো হলো। কাল দাদিমাকে বলেছি চলে যাবার কথা।
– কই, তোমার দাদিমা তো আমারে কিছু কইল না। তাছাড়া কাল যাইবা কেনো! আর কয়দিন পর যাও। তোমার দাদিমা তোমার জন্য আরো অনেক ধরনের পিঠা বানাইবোনে।
দাদা অনেক জোরাজোরি করেও মিজানকে আর কদিন থাকতে রাজি করাতে পারলেন না। মিজান তার কথায় অনড়। শীতের কবলে সে আর থাকতে চায় না। দিতে চায় না শীতকে আর আক্রমণের সুযোগ। এ কদিনের শীতে মিজানের প্রাণ যায়-আসে।
কিছুক্ষণ পর মিজান দৃষ্টি ছুড়ে পশ্চিমের রান্নাঘরে। দেখে রান্নাঘরে দাদিমা কী যেনো পাকাচ্ছেন। এগিয়ে গিয়ে রান্নাঘরে দাদিমার পাশে বসে মিজান বলল, এ কদিন তো বেশ কয়েক ধরনের পিঠা খাওয়ালেন। আপনার পিঠার আইটেম বোধ হয় শেষের দিকে। এতো ধরনের পিঠা এবার খেলাম যে, শহরে যাওয়ার ইচ্ছেটাই ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। আর পিঠার রেশ তো সারা জীবন আমার ঠোঁটে লেগেই থাকবে। তো আজ কী পাকাচ্ছেন দাদিমা?
ঠোঁটে হাসি রেখে দাদিমা বলে উঠলেন, তোমার জন্য আজ তালের রস দিয়া ফিরনি করছি দাদুভাই। তোমার মা খুব পছন্দ করত। গতকাল রাতে তোমার মা ফোন করে বলছে তোমারে করে খাওয়াইতে।
– তাই বুঝি! আপনার হাতের পিঠা যদি এতো সুস্বাদু হয় তাহলে তো ফিরনির স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো হবে। তার ওপর মা বুঝি পছন্দ করেন! দেন দেখি দাদিমা।
মিজান রান্নাঘরে বসেই দু’ প্লেট গলা দিয়ে নামিয়ে দিল। দু-তিনটে ঢেকুর তুলে বলল, দাদিমা আমার আর শহরে যেতেই ইচ্ছে করছে না! মিজান আবার মনে মনে বলছে শহরে গেলেই বাঁচি। কিন্তু দাদিমার সুস্বাদু পিঠা রেখে কিভাবে যে যাই!
দাদিমা একটু ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললেন, কাল ঢাকায় যাওয়ার সময় তোমার মার জন্যও রান্না করে দিমু।
জি দাদিমা। মিজান মাথা নাড়ে।
দুই.
আজ ঘন কুয়াশা আর মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে বাইরে। তীব্র শীতে জবুথবু হয়ে গেছে গ্রামের মানুষ। আর এ হাড়কাঁপানো শীতে ঠাণ্ডাজনিত রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই সবাই যার যার ঘরেই খিল লাগিয়ে শুয়ে-বসে আছে। কেউ কেউ ঘরে বসেই আগুন পোহাচ্ছে।
মিজানের দাদা-দাদি যে টিনশেড ঘরে থাকেন সে ঘরে দুটো চৌকি। একটা উত্তরে, দক্ষিণে অন্যটা। মিজান দক্ষিণ চৌকিতে লেপ মুড়ি দিয়ে জড়সড় হয়ে শুয়ে ছিল। দাদার ডাক শুনে ঘুম ভাঙে মিজানের। উঠে দেখে লেপের উপর আরো একটি মোটা কাঁথা। মিজান বোধ করে, হয়তো রাতে শীত তীব্র হওয়ায় এ কাঁথাটা দাদিমা দিয়েছেন।
– তোমার আজ ঢাকায় যাওয়ার দরকার নাই। আজ বাইরে ঠাণ্ডা বাতাস বেশি। কুয়াশায় কিছু দেখা যায় না। উত্তরের খাটে বসে বললেন মিজানের দাদা। মিজান যেনো আকাশ থেকে পড়ল। গতকাল রাতে দাদিমাকে কত করেই না রাজি করাল ও। আর বাবা-মাকে ফোন করে মিজান বলেছে আজ আসার কথা। কিন্তু সকাল না হতেই ভিন্ন সুর!
হ দাদু ভাই। আজ যাওয়ার দরকার নাই। পাশেই জায়নামাজে বসে বললেন মিজানের দাদিমা। আজ সকালে অজু বানাতে গিয়ে হাত মুখ বরফ হয়ে গেছিলো। আজ শীতটা একটু বেশি।
তাই বলি আজ তোমার যাওয়ার দরকার নাই। তোমার বাবারে ফোন করে তোমার না যাওয়ার কথা জানাইছি। বললেন মিজানের দাদা।
মিজান মাথা নেড়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। লেপের ভেতর মনের সাথে চলছে তার কথোপকথন। আমার পিঠা খাওয়ার শখ মিটে গেছে। আরিফ ঠিকই বলছিল, এ পৌষের শীতে কেনো যে গ্রামে আসলাম! কিন্তু প্রথম প্রথম তো ভালোই লাগছিল। শীত থাকলেও অতটা ছিলো না। গ্রামের কিছুটা ঘুরতে পেরেছি। হাটবাজারেও ঢু মেরেছি কয়েকদিন। তবে এ দু-তিনদিন যাবৎ যে শীত নামছে! বাড়ির উঠোনই আমার বিচরণের সীমানা! এখন শুধু ঢাকা গেলেই বাঁচি।
বাইরে প্রচণ্ড বাতাসে কনকনে হিম বয়ে এনে গুঁড়ি-গুঁড়ি শীতবৃষ্টি পড়ছে। তাই আজ খড়কুটো জ¦ালিয়ে বাইরে কেউ আগুন পোহাতে যাননি। সবাই যার যার ঘরেই কাঁথা মুড়ি দিয়ে জড়সড়োভাবে সোনামণিদের নিয়ে বসে আছেন বা ঘুমোচ্ছেন। আজ শীতের প্রকট অনেক বেশি। হয়তো কারো বেড়ার ফাঁক দিয়ে হিম বাতাস ঢুকে কাঁথা-বালিশ শীতল করে দিচ্ছে।
মিজান লেপের নিচেই কাটিয়ে দিলো সারাদিন। আজ সূর্যও হয়তো উঠেনি। উঠলেও তার আলো বা তেজ কিছুই ছড়ায়নি। তাই মিজানকে ঘর থেকে বের হতে দেননি দাদিমা। তার ভাষ্য হলো, শহুরে মানুষ বলে কথা। ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে লাগলেই জ্বর বইবে শরীরে। আর সর্দি তো আছেই।
দিন ঘনিয়ে রাত ফুরিয়ে গেলো। ফের নতুন ভোর হলো। আজ সূর্য একটু উঁকি দিলো। টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে সূর্যের মিষ্টি আলো মিজানের মুখে পড়ায় ঘুম ভাঙে তার। আজ কুয়াশা ভেদ করে আলো ঠিকই জ্বেলেছে সূর্য কিন্তু ঠাণ্ডা বাতাসও আছে কিছুটা। এ বাতাস কি আর ধরে রাখতে পারে মিজানকে!
মিজান ব্যাগ গুছিয়ে দাদিমার থেকে বিদায় নিলো। বাড়ির অন্য সদস্যদের জানিয়ে বাসস্ট্যান্ডে গেল ও। সঙ্গে দাদাও যান এগিয়ে দেবার জন্য। মিজানকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন মিজানের দাদা।
বাস চলছে শহরের দিকে। মিজান বাসের ভেতরও জড়সড়োভাব নিয়ে বসে আছে। আর ভাবছে, শীতের ভয়ে কি আমি চলে এলাম! কিন্তু দাদিমার পিঠা! আহ! কি যে সুস্বাদু। আর মফস্বলে কাটানো এ কদিন আমার জীবনের অনুপাম দিন হয়ে থাকবে।